ধারাবাহিক প্রতিবেদনের প্রথম পর্ব

রাসেল চৌধুরী :

দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, একমুখী নীতি, মান্ধাতার আমলের পুরাতন যন্ত্রপাতির ভারে ধুঁকছে কর্ণফুলী পেপার মিল (কেপিএম)। আজ অনেকটা বয়সের ভারে, কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় ধ্বংসের মুখে বছর বছর কমছে উৎপাদন ক্ষমতা । দায়দেনা আর লোকসানে মৃতপ্রায় ৭০ বছরের পুরোনো রাষ্ট্রায়ত্ত এ প্রতিষ্ঠানটি।

১৯৫৩ সালে রাঙামাটি পার্বত্য জেলার কাপ্তাই উপজেলার চন্দ্রঘোনায় প্রতিষ্ঠিত হয় কর্ণফুলী পেপার মিলস। শুরুতেই বছরে ৩০ হাজার মেট্রিক টন কাগজ উৎপাদন ক্ষমতা ছিল মিলটির । ২৪ হাজার টন নিজস্ব মণ্ডও তৈরি হতো পেপার মিলটিতে। আর ২২ রকম কাগজ তৈরি করা হতো। ১৯৫৩ সালের ১৬ অক্টোবর প্রতিষ্ঠানটি বাণিজ্যিক উৎপাদনে যায়। শুরুতে ব্যবস্থাপনা ত্রুটি থাকায় ১৯৬৪ সালে পাকিস্তান সরকার দাউদ গ্রুপের কাছে কোম্পানিটি বিক্রি করে দেয়। ১৯৬০ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত এটি বেসরকারি মালিকানাধীন ছিল।

১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতির ২৭ নম্বর আদেশ বলে এটি অধিগ্রহণ করে সরকার। ১৯৭৬ সালে এটি বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) অন্তর্ভুক্ত হয়। মোট এক লাখ ২৭ হাজার ৫২৯ দশমিক ৬০ একর জমির ওপর কেপিএম অবস্থিত। এর মধ্যে ক্রয়কৃত জমি ৪৮ দশমিক ৪৩ একর, লিজকৃত এক হাজার ২০৪ দশমিক ১৭ একর আর শুধু বাঁশ-কাঠ সংগ্রহের জন্য লাইসেন্সপ্রাপ্ত জমি এক লাখ ২৬ হাজার ২৭৭ একর।

বর্তমানে মুমূর্ষু অবস্থায় পড়ে আছে মিলের দানব আকৃতির দালান ও যন্ত্রপাতি। দালানগুলো যেন ভেঙে পড়বে কোনো ঝড়ো বাতাসে। যন্ত্রগুলো পড়ে আছে বিকল। নেই রক্ষণাবেক্ষণ, ব্যবস্থাপনা, পর্যাপ্ত ও দক্ষ শ্রমিক ও কাঁচামাল। সর্বোপরি চাহিদা অনুযায়ী নেই উৎপাদন । লোকসান নিয়ে হোঁচট খাচ্ছে ৭০ বছরের এ প্রতিষ্ঠানটি। ‘মিলে পাওয়ার প্ল্যান্ট, ওয়াটার প্ল্যান্ট, পেপার তৈরির মেশিন ২টি মেশিন চালু থাকলেও ২৩ মে থেকে মিলটি উৎপাদন সম্পূর্ন বন্ধ। এর আগে বন্ধ হয়ে যায় কেমিক্যাল, হাসপাতাল, সিভিল, মেনটেইন্যাস সহ অনেকগুলো ডিপার্টমেন্ট ।

অনুসন্ধানে জানা যায়, শ্রমিকদের বিপুল পাওনা, শ্রমিক ছাঁটাইয়ে অসন্তোষসহ নানামুখী সমস্যার কারণে ধারাবাহিক লোকসানে জর্জরিত রাষ্ট্রয়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ড্রাস্টিজ করপোরেশন’র প্রতিষ্ঠান কর্ণফূলী পেপার মিলস (কেপিএম)। দিনদিন এ প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন ক্রমশই কমে আসছে। কেপিএম সূত্রে জানা যায়, নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে প্রতিষ্ঠানটি তার সোনালী অতীত হারাতে বসেছে।

বর্তমানে এ মিলে কাজ করে প্রায় তিনশ শ্রমিক। ২০০৯-২০১০ অর্থ বছরের প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন ছিলো ১৭ হাজার ৯৫৫ মেট্রিক টন। যা বর্তমানে কমে ৫ হাজার ৬৫২ মেট্রিক টনে ঠেকেছে।

কর্ণফুলী পেপার মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. এম এ আব্দুল কাদের বলেন, ‘মিল এখন জীর্ণ অবস্থায় । মিল সংস্কার করতে গেলে অনেক খরচের মুখোমুখি হতে হবে। তাই সংস্কারের চেয়েও মিলের নতুন রূপ তৈরির চেষ্টা করতে হবে। এ নিয়ে আমাদের পরিকল্পনা আছে। মন্ত্রণালয়ও চায়, এ মিল সচল হোক। তাই আশা করছি, খুব অল্প সময়ে আমরা আমাদের সমস্ত সংকট দূর করতে পারবো।’

এদিকে কাঁচামাল সরবরাহ এবং সরকারি অর্ডার না থাকার অজুহাতে ২৩ মে থেকে কেপিএম এর উৎপাদন একেবারে বন্ধ। ২৩ মে মহাব্যবস্থাপক এর পক্ষে কেপিএম এর ব্যবস্হাপক( প্রশাসন) মো: মাজহারুল ইসলাম সাক্ষরিত এক দপ্তর আদেশে এখানকার কর্মরত কোম্পানি মাষ্টার রোল, অস্হায়ী শ্রমিক কর্মচারী এবং পে-অফ কর্মকর্তাদের গত ২৪ মে থেকে উৎপাদন শুরু না হওয়া পর্যন্ত কাজে যোগদান না করতে আদেশ দেওয়া হয়। অনুসন্ধানে জানা যায়, আবাসিক এলাকায় বিদ্যুৎ এবং তীব্র পানীয়জলের সংকটে ভুগছেন কেপিএম আবাসিক এলাকায় বসবাসরত স্থায়ী শ্রমিক কর্মচারীরা।

লোকসানে মৃতপ্রায় কর্ণফুলী পেপার মিলস লিমিটেড। যদিও এক সময় দেশের কাগজের চাহিদার সিংহভাগ পূরণ করত এ কোম্পানি। তবে পুরোনো ও অকেজো যন্ত্রপাতি আর অদক্ষ ব্যবস্থাপনায় এখন ডুবছে রাষ্ট্রায়ত্ত এ কাগজকলটি।

অনুসন্ধানে জানা যায়, পার্বত্য এলাকায় বনজ কাঁচামাল এবং দেশে শ্রমের সহজলভ্যতা থাকায় খুব অল্প সময়ের মধ্যে লাভের মুখ দেখে কেপিএম। এ লাভের টাকায় সেখানে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল কর্ণফুলী রেয়ন মিলস লিমিটেড। এই প্রতিষ্ঠানের তিনটি ইউনিটে দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা ১১০ থেকে ১৩০ মেট্রিক টন। লাভের ধারাবাহিকতা ২০০১ সাল পর্যন্ত বজায় ছিল। ২০০১ পরবর্তী সময়ে নানামুখী দুর্নীতি ও অনিয়ম কেপিএমকে লোকসানী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির লোকসান কয়েকশো কোটি টাকা। অবসরে যাওয়া শ্রমিক-কর্মচারীদের অনেক পাওনা ও বকেয়া রয়েছে।

কাঁচামাল ও বিভিন্ন সামগ্রী সরবরাহ বাবদ প্রতিষ্ঠানটির কাছে ঠিকাদার ও সরবরাহকারীরা পাওনা রয়েছে প্রায় শত কোটি টাকা। এত বড় অঙ্কের পাওনা পরিশোধ এবং নতুন করে অর্থ যোগান দিয়ে কারখানাটিকে সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। লোকসানের মধ্যে থাকায় ঠিকাদাররাও কাঁচামাল সরবরাহে আগ্রহ হারিয়েছেন।

লোকসানী প্রতিষ্ঠানে পরিণত এই প্রতিষ্ঠানটি এখন চরম অর্থ সঙ্কটে জর্জরিত। বিসিআইসি’র পক্ষ থেকে দফায় দফায় বরাদ্দ দিয়েও কারখানাটিকে লাভজনক করা সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে লোকসানি এ মিলে কাগজ উৎপাদন ক্রমশ কমছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৯ হাজার মেট্রিক টন কাগজের উৎপাদন কম হয়। বর্তমানে কেপিএম বন্ধ হয়ে যেতে পারে এমন আশঙ্কায় বিচলিত সেখানে কমর্রত শ্রমিক-কর্মচারীরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কেপিএম এর কালেক্টিভ বার্গেনিং এজেন্ট’র (সিবিএ) তিনটি শ্রমিক সংগঠন রয়েছে। এর মধ্যে প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে শ্রমিক কর্মচারী পরিষদ নেতৃত্ব প্রদান করছে।

শ্রমিক-কর্মচারী পরিষদ সিবিএ সভাপতি আবদুল রাজ্জাক বলেছেন, কেপিএম এখন ধ্বংসের পথে। প্রতিষ্ঠানটির কোন অগ্রগামী নেই। নেই কোন মেইনট্যান্স । তিনি আরও বলেন, কারখানার মেশিন (টারবাইন) চালানোর জন্য প্রতিদিন গড়ে ১০টন গ্যাস ব্যবহার করা হয়। মাসে খরচ পড়ে দেড় কোটি টাকার মতো। কিন্তু যে পরিমাণ খরচ হচ্ছে সে পরিমাণ কাগজ উৎপন্ন করা যাচ্ছে না। কারণ কাগজ উৎপন্ন করার জন্য যে ধরণের আধুনিক মেশিনারিজ দরকার হয় তেমন মেশিন এ প্রতিষ্ঠানে নেই। পুরনো আমলের যে মেশিনগুলো আছে তা সংস্কার না করার কারণে নষ্ট হওয়ার পথে।বর্তমানে শ্রমিকদের দু’মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে। উৎপাদন না থাকায় শ্রমিকরা বেতন বঞ্চিত হচ্ছে।

শ্রমিকদের এ নেতা জানান, মূলত কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা এবং অর্থ বিনিয়োগ না করায় প্রতিষ্টানটি এখন ধ্বংসের মুখে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, এখনো সময় আছে কর্তৃপক্ষ যদি সুনজর দেয় এবং নতুন করে অর্থলগ্নি করে তাহলে কেপিএম তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে।

এ বিষয়ে জানতে কর্ণফুলী পেপার মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ডা: এমএম কাদেরের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও কোন সাড়া পাওয়া যায়নি। পরে পরিচয় দিয়ে একটি ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হলেও কোন সাড়া আসেনি।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ১২-১৩ বছর ধরে মিলটি খারাপ হতে হতে বর্তমানে মুমূর্ষু অবস্থায় দাঁড়িয়েছে। দুর্নীতি, পুরাতন যন্ত্রপাতিতে উৎপাদন, মেরামত ও অবকাঠামোগত সংস্কার না করাই এ দুরবস্থার মূল কারণ।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, ১৯৫৩-৫৪ অর্থবছরে ১২ হাজার ৯১০ টন দিয়ে উৎপাদন শুরু করে কেপিএম। ১৯৮৩-৮৪ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো তিন কোটি ১০ লাখ ২০ হাজার টাকা লোকসান গোনে প্রতিষ্ঠানটি। আর গত ১০ অর্থবছরে কেপিএমের লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৬১ কোটি ৭৭ লাখ সাত হাজার টাকা। এর মধ্যে ২০০৯-১০ অর্থবছরে লোকসানের পরিমাণ প্রায় ৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকা, ২০১০-১১ অর্থবছরে ১৩ কোটি ৪৫ লাখ, ২০১১-১২ অর্থবছরে ৪০ কোটি ২২ লাখ, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ৪৮ কোটি ৯ লাখ, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৬৮ কোটি দুই লাখ, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৭০ কোটি ৯৪ লাখ, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৭৭ কোটি ২০ লাখ, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৬৫ কোটি ৫৯ লাখ, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৪১ কোটি ২৩ লাখ ও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে লোকসানের পরিমাণ ২৭ কোটি ২৯ লাখ টাকা। এছাড়া চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) কেপিএম লোকসান দিয়েছে প্রায় ১২ কোটি ৪৬ লাখ টাকা।

এদিকে ২০১৯ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত কেপিএমের ক্রমপুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৬৬ কোটি ২৬ লাখ ১৯ হাজার টাকা। এছাড়া প্রতি বছরই বাড়ছে কেপিএমের দেনার পরিমাণ। গত আড়াই বছরে এর দেনার পরিমাণ বেড়েছে ১০৭ কোটি চার লাখ ৪৮ হাজার টাকা। ২০১৭ সালে দেনার পরিমাণ ছিল ৭০৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা। বর্তমানে কেপিএমের মোট দেনার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮১০ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি খাতে ৫৭৪ কোটি ৯২ লাখ ও অন্যান্য খাতে ২৩৫ কোটি ৬৫ লাখ টাকা।

সরকারি খাতের দেনার মধ্যে সুদবিহীন ঋণ পাঁচ কোটি ৭১ লাখ টাকা, সরকারি বিএমআর ১৫২ কোটি পাঁচ লাখ টাকা, ডিবেঞ্চার ঋণ ১১ কোটি ২৩ লাখ টাকা, অনুৎপাদন খাতে (এডিবি) ১৩ কোটি পাঁচ লাখ, সিইউএফএল ৯ কোটি দুই লাখ টাকা, বিসিআইসির দেনা ৩৫৭ কোটি ৭৯ লাখ টাকা ও আন্তঃপ্রকল্প খাতে দেনা ২৬ কোটি সাত লাখ টাকা।

অন্যান্য খাতে দেনার মধ্যে সরবরাহকারীদের দেনা ৮২ কোটি ৩২ লাখ টাকা, গ্র্যাচুইটি দায় ৮৩ কোটি ৯১ লাখ টাকা, পিএফ ৬৪ কোটি সাত লাখ টাকা, ক্যাশ ক্রেডিট তিন কোটি ৯৪ লাখ টাকা ও বকেয়া বেতন এক কোটি ৪১ লাখ টাকা।

অন্যদিকে সম্প্রতি মিল এমডি ড. এমএম এ কাদেরের একের পর এক দুর্নীতি অনিয়ম নিয়ে সংবাদ সম্মেলন হয়েছে জানা যায়। অনুসন্ধানে জানা যায় গত ১২ ফ্রেব্রুয়ারি কর্ণফুলী পেপার মিলস লি. (কেপিএম) হতে পুরাতন স্ত্র্যাপ যন্ত্রাংশের আড়ালে লাখ লাখ টাকার যন্ত্রাংশ পাচারের অভিযোগে স্থানীয় জনতা, প্রশাসন ও ইউপি চেয়ারম্যানের সহায়তায় ৩টি ট্রাক আটক করে। পরবর্তীতে তরিগরি করে কাগজপত্র বানিয়ে এমডি তা পাচার করার অভিযোগ উঠে আসে।

সরেজমিনে জানা গেছে, বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির লোকসান কয়েকশ’ কোটি টাকা। অবসরে যাওয়া শ্রমিক-কর্মচারীদের অনেক পাওনা ও বকেয়া রয়েছে। কাঁচামাল ও বিভিন্ন সামগ্রী সরবরাহ বাবদ প্রতিষ্ঠানটির কাছে ঠিকাদার ও সরবরাহকারীদের পাওনা রয়েছে প্রায় শত কোটি টাকা। এত বড় অঙ্কের পাওনা পরিশোধ এবং নতুন করে অর্থ যোগান দিয়ে কারখানাটি সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। লোকসানের মধ্যে থাকায় ঠিকাদাররাও কাঁচামাল সরবরাহে আগ্রহ হারিয়েছেন।

চলবে …….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here